আমরা কেন পড়ি? (لماذا نقرأ؟)
পড়া মানুষের জীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ কেবল তথ্য সংগ্রহের জন্য পড়ে না; বরং নিজেকে গড়ে তোলার জন্য, সত্যকে জানার জন্য, চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করার জন্য এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগত ও তাঁর দ্বীনকে গভীরভাবে বোঝার জন্য পড়ে। যে জাতি পড়ে, সে জাতি চিন্তা করতে শেখে; আর যে জাতি চিন্তা করতে শেখে, সে-ই সভ্যতা নির্মাণ করে।
ইসলামে জ্ঞানার্জনের সূচনা হয়েছে “পড়ো” (اقرأ) নির্দেশনার মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম যে ওহী নাযিল করেন, তা ছিল—
«﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ﴾
পড়ুন আপনার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সূরা আল-আলাক: ১।
এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পড়া কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ নয়; বরং এটি একটি ইবাদত, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়।
আমরা পড়ি প্রথমত মহান আল্লাহকে জানার জন্য। কুরআন, হাদীস, তাফসীর, আকীদাহ, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞান অধ্যয়নের মাধ্যমে মানুষ তার রবকে চিনতে শেখে, তাঁর নাম ও গুণাবলি (أسماء الله وصفاته) সম্পর্কে অবগত হয় এবং তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার পথ খুঁজে পায়। কারণ ইলম ছাড়া সঠিক ইবাদত ও সঠিক আমল সম্ভব নয়।
আমরা পড়ি অজ্ঞতা দূর করার জন্য। অজ্ঞতা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। এটি মানুষকে কুসংস্কার, বিভ্রান্তি, বিদআত, শিরক এবং ভ্রান্ত চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। আর ইলম মানুষের অন্তরে নূর সৃষ্টি করে, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে এবং তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
আমরা পড়ি নিজেকে সংশোধন করার জন্য। ভালো বই কেবল তথ্য দেয় না; মানুষের চরিত্র গঠন করে। কুরআনের তিলাওয়াত, হাদীস অধ্যয়ন, সালাফদের জীবনী, ইতিহাস এবং নৈতিক সাহিত্য মানুষের অন্তরকে কোমল করে, আত্মসমালোচনা শেখায় এবং উত্তম চরিত্র (حسن الخلق) অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে।
আমরা পড়ি চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করার জন্য। যে মানুষ পড়ে, সে প্রশ্ন করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে, প্রমাণের মূল্য বুঝতে শেখে এবং আবেগের পরিবর্তে দলিলের ওপর দাঁড়াতে শেখে। পড়াশোনা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে এবং তাকে পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিচক্ষণ করে তোলে।
আমরা পড়ি উম্মাহ ও মানবতার উপকার করার জন্য। প্রকৃত জ্ঞান কখনো কেবল নিজের জন্য সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন আলিম, শিক্ষক, গবেষক বা লেখক তার অর্জিত জ্ঞান অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। এভাবেই ইলম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায় এবং সমাজ আলোকিত হয়।
আমরা পড়ি ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করার জন্য। উৎকৃষ্ট সাহিত্য, আরবি ভাষার মূল গ্রন্থ, কুরআন, হাদীস এবং শুদ্ধ রচনাশৈলী নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে মানুষের ভাষা, শব্দভাণ্ডার, চিন্তার গভীরতা এবং লেখনী শক্তিশালী হয়। একজন ভালো পাঠকই একদিন ভালো বক্তা, লেখক ও চিন্তাবিদ হয়ে ওঠেন।
তবে পড়ার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সব বই সমান উপকারী নয়। তাই একজন মুসলিমের উচিত এমন বই নির্বাচন করা, যা তার ঈমান, ইলম, চরিত্র ও চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে। সালাফে সালেহীনের রচনা, নির্ভরযোগ্য তাফসীর, সহীহ হাদীসের গ্রন্থ, আকীদাহ, ফিকহ, সীরাত, ইতিহাস এবং উপকারী জ্ঞানভিত্তিক বইকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
পড়া তখনই প্রকৃত ফল দেয়, যখন তা আমলে পরিণত হয়। কেবল বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো বা তথ্য মুখস্থ করাই উদ্দেশ্য নয়; বরং পড়ার মাধ্যমে মানুষ যেন আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হয়, তার চরিত্র আরও সুন্দর হয় এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষে পরিণত হয়—এটাই প্রকৃত সফলতা।
সুতরাং, আমরা পড়ি ডিগ্রির জন্য নয়; সত্যকে জানার জন্য। আমরা পড়ি বিতর্কে জেতার জন্য নয়; নিজের অজ্ঞতাকে দূর করার জন্য। আমরা পড়ি মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য। যে পড়া মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানবতার কল্যাণে নিবেদিত করে সেই পড়াই সবচেয়ে মূল্যবান, সবচেয়ে ফলপ্রসূ এবং সবচেয়ে বরকতময়।
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।




