যে দো‘আ আমরা পড়ি, কিন্তু খুব কমই অনুভব করি-
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার আযকারে (أذكار الصباح والمساء) আমরা কত দো‘আই না পড়ি। কিন্তু কতটুকু তার অর্থ হৃদয়ে পৌঁছায়? কতবার আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে বলেছি—
وأعوذُ بعظمتِكَ أنْ أُغتالَ من تحتي
হে আল্লাহ! আমি আপনার মহান মহিমার আশ্রয় চাই, যেন আমি নিচ থেকে আকস্মিকভাবে ধ্বংস বা আক্রান্ত না হই।
অধিকাংশ সময় এই বাক্যটি আমাদের ঠোঁট অতিক্রম করে যায়, কিন্তু হৃদয়ে তার কোনো আলোড়ন তোলে না। আমরা দৃঢ় ভূমির ওপর নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে থাকি, যেন এই মাটিই আমাদের নিরাপত্তার শেষ ভরসা। অথচ আমরা ভুলে যাই পৃথিবী নিজে কোনো স্বাধীন শক্তির অধিকারী নয়; সে-ও আল্লাহরই এক সৃষ্টি। তাঁর ইচ্ছায় সে স্থির থাকে, আর তাঁরই আদেশে কেঁপে ওঠে।
তারপর হঠাৎ এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন দৃঢ় মনে হওয়া ভূমিই কেঁপে ওঠে। দেয়াল দুলতে শুরু করে, মানুষের কৃত্রিম নিরাপত্তাবোধ মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই কম্পনই মানুষকে বুঝিয়ে দেয় সে কত অসহায়, কত দুর্বল এবং আল্লাহর হেফাজত ছাড়া তার কোনো আশ্রয় নেই।
এই দো‘আয় ব্যবহৃত أُغتال শব্দটির মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। اغتيال অর্থ এমন আকস্মিক আঘাত, যা অপ্রত্যাশিতভাবে আসে, যেখানে মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করেছিল, সেখান থেকেই। ভূমিকম্পও ঠিক তেমনই; পূর্বঘোষণা ছাড়াই আসে, সুযোগ না দিয়েই মানুষকে বিস্মিত করে।
আর এ কারণেই এখানে আল্লাহর عظمة মহিমা ও পরাক্রমের আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ যখন পৃথিবীর সব ভরসা ভেঙে পড়ে, তখন একমাত্র সেই মহান রবই নিরাপত্তা দিতে পারেন, যিনি আসমান ও জমিনকে ধারণ করে রেখেছেন।
এ ধরনের ঘটনা একজন মুমিনের জন্য শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি আত্মজাগরণেরও আহ্বান। বাহ্যিক কম্পন যেন অন্তরের গাফলতাকেও কাঁপিয়ে দেয়। এমন সময় মানুষের উচিত নিজের জীবনকে নতুন করে পর্যালোচনা করা, গুনাহ থেকে তাওবা (التوبة) করা, মানুষের হক আদায় করা এবং আল্লাহর দিকে বিনীত হৃদয়ে ফিরে আসা।
প্রকৃত আশ্রয় বিস্তৃত রাস্তা, মজবুত ভবন কিংবা বাহ্যিক উপকরণে নয়; প্রকৃত আশ্রয় একমাত্র আল্লাহর কাছেই। তিনি চাইলে নিরাপত্তা আসে, আর তিনি চাইলে সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তিও মুহূর্তে নড়ে যায়।
তাই আমরা যখন এই দো‘আ পড়ি—
وأعوذُ بعظمتِكَ أنْ أُغتالَ من تحتي
তখন যেন তা কেবল মুখের উচ্চারণ না হয়; বরং অন্তরের আর্তি হয়ে উঠুক। যেন প্রতিটি শব্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের নিরাপত্তা, জীবন ও ভবিষ্যৎ সবই আল্লাহর হাতে। আর সেই উপলব্ধিই আমাদের ঈমানকে আরও গভীর করুক, তাওবাকে আরও আন্তরিক করুক এবং আমাদেরকে সর্বদা তাঁরই আশ্রয়প্রার্থী বানিয়ে রাখুক। আমীন!




