অন্তরের এক মারাত্মক রোগ: বিরোধিতা
আমাদের মাঝে এক ধরনের অদৃশ্য হৃদরোগ আছে, যার প্রভাব দুনিয়াতেও নেতিবাচক এবং দ্বীনের পথে চলা ও সুন্দর-সুষ্ঠু সমাজ গঠনেও মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। আর সে রোগ হলো ‘বিরোধিতা ও বিবাদ’ (الخصومة)।
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক জটিল; সেখানে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে মতবিরোধ মেনে নেয় এবং বিরোধ মিটিয়ে ফেলে। এই দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধের ফলে অন্তরে কিছু রোগ জন্ম নেয়। যেমন: (১) নিজ মতামতের প্রতি অন্ধ পক্ষপাত (تعصب للرأي)। (২) ভিন্নমতের মানুষের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
এই রোগগুলো যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা একসময় স্পষ্ট বিরোধিতায় রূপ নেয়। আর এই বিরোধিতা পুরনো হয়ে গেলে তা অন্তরে পরিণত হয় ঘৃণা ও বিদ্বেষে। অনুরুপভাবে বিরোধিতায় ‘অত্যাচার’ বা ‘অসততা’ (الفجور) একটি মারাত্মক আশঙ্কাজনক লক্ষণ। এটি মুনাফিকির চার আলামতের একটি। যার কারণ হলো- বিরোধিতায় যে অসৎ আচরণ করে, মূলতঃ সে কখনোই সম্পর্কের ক্ষেত্রে ও দ্বীনী বিষয়ে আন্তরিক ছিল না।
এজন্যই বিরোধিতা এক পর্যায়ে পাপাচার ও অসততায় রূপ নেয়। যেমন: সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর অপরের গোপন বিষয় ফাঁস করে দেওয়া, ইজ্জত নষ্ট করা। কিন্তু একজন সম্মানিত মানুষ; সে নিজেকে সংযত রাখে, বিশ্বস্ততার বোঝা বয়ে বেড়ায় এবং ভালো ছাড়া কিছু বলে না। বরং সম্ভবপর চুপ থাকে। এই রোগ যত বাড়ে, মানুষের চোখে তখন মুসলিম ভাই ‘একজন প্রতিপক্ষ’ হয়ে যায়। সে তার কোনো ভালো গুণ দেখতে পায় না, সব খারাপ দিক তার মাঝে কল্পনা করে।
ফলস্বরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তির অন্তর কাঁপে ও তা সময়ে সময়ে ক্ষুব্ধ হয়। তার মনে কুট-কৌশলের বীজ বপণ চলতেই থাকে। আর যখন তার শত্রু মনে করা ব্যক্তি কোনো ইতিবাচক কিছু অর্জন করে তখন সে আরো বিরোধিতা শুরু করে। এমনকি সে প্রতিপক্ষের কোনো প্রশংসা সহ্য করতে পারে না। সে চেষ্টা করে তার সব গুণ অস্বীকার করতে। কখনো তার লেখালেখি ও মতামত শুধুই প্রতিপক্ষকে অপমান বা খাটো করার লক্ষ্যে হয়ে পড়ে।
এই রোগের একটি বড় লক্ষণ হলো- কু-ধারণা (سوء الظن), যার ফল হয় ভুল বোঝাবুঝি। এ এক অব্যর্থ সূত্র। কু-ধারণা জন্ম দেয় ভুল ব্যাখ্যার, যার ফলে অন্যের বক্তব্য বা অবস্থান সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব হয় না। আবার রোগাক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে নসীহতকারী বলে উপস্থাপন করে, অথচ সে কখনো গোপনে পরামর্শ দেয় না; বরং খোলামেলা সমালোচনাই তার পছন্দ। আসলে এটি তার অন্তরের গোপন বিদ্বেষ ও হিংসার ক্ষুধা মেটানোর পথমাত্র। কিন্তু সত্য এই যে, এই পদ্ধতি দুনিয়াতে যেমন ফলহীন, আখিরাতেও তেমনই ক্ষতির কারণ।
কাজেই এই ধরনের রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে বলা উচিত- দ্বীনের নসীহতের ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও সাহায্য করা। তাহলে কেন আমি আপনার মাঝে ভালবাসা দেখি না? কেন আমি আপনার মাঝে সাহায্যের চিহ্ন দেখতে পাই না? বরং দেখি, আপনি সবসময় নসীহত এর নামে এক ধরনের সমালোচনার পোশাক পরিহিত, যার ভেতর থেকে হিংসার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে!
কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি। আমরা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজেই অনেক মুসলিম ভাইদের সম্পর্কের ভেতরে বিরোধিতা আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তারা সামান্য কারণেই শত্রুতায় লিপ্ত হয়। সুযোগ পেলেই অবান্তর-অন্যায্য কথা বলে। এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয়, কারণ তারা তো সবাই মুসলিম। আবার সালাফী আকীদা ও মানহাজের দাবিদার! আরো অবাক করা বিষয় হলো- কোনো ব্যক্তির থেকে একটি ভুল বের হলেই লোকেরা তাকে নিচে নামিয়ে দেয়। এটি এমন নীচতা, যা কেবল সেই মানুষ করে যার মাঝে বিশ্বস্ততা কম।
অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে- আর আমাদের দল ও সংগঠনের মধ্যে সম্পর্কের জায়গায় গীবত, সমালোচনা ও বিদ্বেষ আধিপত্য করে আছে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত আফসোসের বিষয় হলো- অনেক লেখালেখি, বক্তব্য, বিতর্ক, বইপত্র বা চিন্তাধারার তত্ত্বায়ন আসলে শুধু পুরনো বিরোধিতার ফসল। এই বিষবাষ্প এখন সমাজ থেকে শিক্ষাঙ্গনে পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন-
إياكم والبغضة فإنها الحالقة لا أقول تحلق الشعر ولكن تحلق الدين
তোমরা বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তা হচ্ছে ধ্বংসকারী। আমি বলছি না, তা চুল কাটে; বরং তা দ্বীনকে কেটে ফেলে। [তিরমিযী]। এই হাদীস থেকে প্রকাশ্য একটি উপলব্ধি হচ্ছে- যে ব্যক্তি তার অন্তরে বিদ্বেষ প্রবেশ করতে দেয়, তার দ্বীন ধ্বংস হয়ে যায়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের অন্তর ও দ্বীন পরীক্ষা করা। আত্মসমালোচনা জারি রাখা।
উপরোল্লিখিত আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কেবল নিজেকে হিসাবের মুখোমুখি করা; যেন কিয়ামতের দিন কেউ এভাবে চমকে না ওঠে যে, তার জীবন বিরোধিতা, বিদ্বেষ ও অহেতুক লড়াইয়ে কেটে গেছে। অথচ সে মনে করেছে সে অনেক ভালো কাজই করে গেছে। হে আল্লাহ আপনি আমাদের অন্তরগুলো প্রশস্ত করে দিন। মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা রাখার তৌফীক্ব দান করুন। আমরা দুআ করি-
اللهم طهر قلوبنا من الغِلّ والحقد، واملأها بالحب والنصح والرحمة.
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে বিদ্বেষ ও হিংসা থেকে পরিশুদ্ধ করুন এবং তাতে ভালবাসা, উপদেশ ও দয়া পূর্ণ করে দিন। আমীন!
– ট্রেনযাত্রা/ রাজশাহী-কুষ্টিয়া/ ৪.৭.২৫ জুমু’আ বার।




