তবে শুরু করুন নিজের থেকেই……………..
মানুষের জীবনে যে বিষয়ের ওপর সবচেয়ে কম নিয়ন্ত্রণ থাকে তা হলো তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ। সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছে এক বড় আমানত; তাদের নিষ্পাপ হৃদয় জীবনের কঠোরতা সহ্য করার মতো শক্ত নয়, আর সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত সামাল দেওয়ার মতো পরিপক্কতাও নেই। তাই আমরা তাদের জন্য ভয় পাই দুনিয়ার উত্থান-পতন থেকে, মানুষের প্রতারণা থেকে, এমন সব দুঃখ-কষ্ট থেকে যেগুলো আমরা নিজেরা সরিয়ে দিতে পারি না। এজন্য আমরা চেষ্টা করি তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে, শক্তিশালী দুর্গ গড়তে, সুস্পষ্ট পথ সাজিয়ে দিতে।
কিন্তু আমরা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাই যে, সন্তানের জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার টাকা-পয়সা, মর্যাদা বা বাহ্যিক সুরক্ষা নয়; বরং আমাদের নিজেদের ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্ম।
আপনার সৎ চরিত্র, গোপন-প্রকাশ্য নেক আমল, আল্লাহভীতি এসবই আপনার সন্তানের জন্য প্রকৃত দুর্গ, যা আপনার মৃত্যুর পরও তাদের ঘিরে রাখে। এটাই প্রকৃত উত্তরাধিকার, যা কখনো নষ্ট হয় না।
১. পিতা-মাতার তাকওয়াই সন্তানের প্রকৃত নিরাপত্তা: হে বাবা-মা, আপনার আল্লাহভীতিই হলো সন্তানের প্রকৃত ঢাল। আপনার আন্তরিক ইবাদত, গোপনে কান্না, সত্যবাদিতা এসবই সন্তানের জীবনে অদৃশ্য নিরাপত্তা তৈরি করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ وَلْيَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا – আর যারা ভয় করে যে তাদের পর তারা দুর্বল সন্তান রেখে যাবে। তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে, এবং সঠিক কথা বলে (নিসা: ৯)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সে আগে নিজের তাকওয়া ও আমল ঠিক করুক, এটাই তাদের জন্য সর্বোত্তম সুরক্ষা।
২. পিতা-মাতার নেক আমল সন্তানের ওপর রহমত হয়ে নেমে আসে: সৎকর্ম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সন্তানদের চারপাশে বিস্ময়কর সুরক্ষা তৈরি করে।
অনেক সন্তান যে বিপদ থেকে বেঁচে যায়, তা হয় মায়ের গোপন দুআ, বাবার কান্না বা তাদের নেক আমলের বরকতে। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُم ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ – যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও ঈমান নিয়ে তাদের অনুসরণ করেছে—আমি তাদের সঙ্গে তাদের সন্তানদেরও মিলিত করে দেব (তুর: ২১)। সৎ বাবা-মায়ের আমল আল্লাহ কখনো নষ্ট করেন না; বরং তাদের সন্তানকেও তার সুফল দেন।
৩. সন্তানদের দোয়া পিতা-মাতার মর্যাদা বৃদ্ধি করে: রাসুল ﷺ বলেছেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّة فَيَقُولُ: أَنَّى لِي هَذَا؟ فَيُقَالُ: بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ – নিশ্চয়ই একজন মানুষের জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। সে জিজ্ঞেস করবে, আমার মর্যাদা কেন বাড়ানো হলো? বলা হবে, তোমার সন্তানের তোমার জন্য ইস্তিগফার করার কারণে (ইবনু মাজাহ)। অর্থাৎ, সন্তানের নেক আমল বাবা-মায়ের উন্নতির কারণ হয়, আর বাবা- মায়ের নেক আমল সন্তানের উন্নতির কারণ হয়।
এটা উভয়ের মাঝে এক অটুট সম্পৃক্ত সম্পর্ক।
৪. পিতা-মাতার সৎকর্ম—সন্তানের জীবনের অদৃশ্য পাহারাদার: মহান ফযীলাত পূর্ণ একটি হাদীস, إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ -মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া। যথা: (১) চলমান সাদকাহ (২) উপকারী জ্ঞান (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (সহীহ মুসলিম)। তাই, নিজেকে আপনার সন্তানের জন্য চলমান সাদকাহ বানান। তাদের সামনে ভালো আদর্শ হন। তাদের মাঝে তাকওয়া, সততা, দয়া, লজ্জাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা রোপণ করুন।
৫. কুরআন—সন্তানদের রক্ষায় পিতা-মাতার নেক আমলের প্রমাণ: মহান আল্লাহ বলেন, وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا – তাদের পিতা ছিলেন সৎ (কাহাফ: ৮২)। সৎ পিতার বরকতে দুই অনাথ শিশুর ধন সম্পদ আল্লাহ নিজেই সংরক্ষণ করেছিলেন; তখন তাদের দেখাশোনার কেউ ছিল না, কিন্তু আল্লাহ তাদের রক্ষক হয়ে গেলেন। হাসান বাসরী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমি আমার নফল ইবাদত বৃদ্ধি করি, এই আশা নিয়ে যে আল্লাহ আমার সন্তানকে নেক বানিয়ে দেবেন।
সুতরাং সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় শুরু হচ্ছে নিজেকে ঠিক করা। হে প্রিয় বাবা-মা, যদি সত্যিই সন্তানদের ভালোবাসেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত হন। তবে ভুলে যাবেন না, সবকিছুর শুরু আপনার নিজের থেকেই। আপনি যদি আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ঠিক করেন, আল্লাহ আপনার সন্তানদের অন্তরও ঠিক করে দেবেন। তাদের হিফাযত করবেন, বরকত দেবেন, তাদেরকে আপনার চোখের ঠাণ্ডা শান্তি বানাবেন। আজ থেকেই শুরু করুন, কারণ আপনার প্রতিটি নেক কাজ আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের পাতায় লেখা হয়। আপনার প্রতিটি নিঃশব্দ দুআ তাদের জীবনের নিরাপত্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
– আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
▪️দুঃখের প্রশংসায় মিশ্র আলাপন-













