সালাফিয়্যাহ: এটি একটি মানহাজ, নাকি কোনো দল?
বর্তমান সময়ে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সালাফিয়্যাহর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও তীব্র আক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মিডিয়া অঙ্গনে যেন এক ধরনের সংগঠিত প্রচারণা চলছে, যা অনেক সচেতন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এমনকি কেউ কেউ এটিকে ‘সালাফিয়্যাহ-বিরোধী মৌসুম’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো সালাফিয়্যাহর বিরুদ্ধে আক্রমণ কোনো নতুন বিষয় নয়; এটি সর্বদাই চলমান। কখনো তা তীব্র হয়, আবার কখনো কিছুটা স্তিমিত হয়। অর্থাৎ, সালাফিয়্যাহকে আক্রমণ করার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই; বরং এটি অনেক মানুষের জন্য একটি স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা ইসলামী বিকল্পের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে বা ভীত থাকে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো সালাফিয়্যাহ কি একটি মানহাজ, নাকি একটি নির্দিষ্ট দল বা সংগঠন?
যারা সালাফিয়্যাহর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়, তাদের অধিকাংশই এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, তাদের বিরোধিতা মূলত ইসলামের মানহাজের প্রতিই নিবদ্ধ। ফলে ‘সালাফিয়্যাহ মানহাজ না দল’ এই পার্থক্য তাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
বাস্তবিক অর্থে, সালাফিয়্যাহ হলো একটি মানহাজ, যা ইসলামের পথে চলার একটি পদ্ধতি। যখন মানুষ ইসলামের ব্যাখ্যা, বিধান ও পদ্ধতি নির্ধারণে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যায় বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সালাফিয়্যাহ এসে দাঁড়ায় ‘সালাফে সালেহীন’-এর (সাহাবী, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈন) অনুসৃত পথের উপর। কারণ তারা ছিলেন এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম দ্বীনে সবচেয়ে বিশুদ্ধ, মর্যাদায় সর্বোচ্চ, বুঝে গভীরতম এবং নবী ﷺ-এর সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী। সুতরাং, যে ব্যক্তি তাদের পথ অনুসরণের চেষ্টা করে, সে-ই সালাফী, সে যেই দল বা সংগঠনের সাথেই যুক্ত থাকুক না কেন।
সালাফিয়্যাহর মূল ভিত্তি হলো এই মহান প্রজন্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের অনুসরণ করা এবং নিজেদের ও পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করা। এটি তাদেরকে ভুলের ঊর্ধ্বে স্থাপন করা নয়; বরং তাদের বুঝ ও পথনির্দেশনা থেকে আলোক গ্রহণ করা।
সালাফিয়্যাহ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে সর্বোচ্চ স্থান দেয় এবং এগুলোকেই মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। কোনো সহীহ নসকে ব্যক্তিগত মত, প্রবৃত্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির কারণে প্রত্যাখ্যান করা হয় না; বরং তা মেনে নেওয়া হয় এবং তার অনুসরণ করা হয় যখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ।
এছাড়া সালাফিয়্যাহ বিশ্বাস করে যে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা; যেখানে ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন সবই অন্তর্ভুক্ত। এটি ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, দুনিয়া ও আখিরাত সব ক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
সালাফিয়্যাহ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ইবাদত (তাওহীদ) এবং মানুষের আকীদা ও আমলকে বিদআত, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে পরিশুদ্ধ করার ওপর।
এই হলো সালাফিয়্যাহর মৌলিক নীতিমালা। সুতরাং, যে ব্যক্তি এই নীতিগুলো মেনে চলে এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, সে-ই সালাফী। আর যে এগুলো থেকে বিচ্যুত হয়, সে সালাফিয়্যাহ থেকে দূরে সরে যায়।
‘সালাফিয়্যাহ একটি মানহাজ, দল নয়’ এর অর্থ কী? যথা-
১. সালাফিয়্যাহর কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি বা মুখপাত্র নেই। কোনো ব্যক্তি বা দল এমন নয়, যার মতামতই সালাফিয়্যাহর চূড়ান্ত মত হিসেবে বিবেচিত হবে। বরং এটি এমন একটি পদ্ধতি, যা ব্যক্তি ও দলকে যাচাই করে কিন্তু নিজে কারো দ্বারা যাচাইযোগ্য নয়।
২. শুধুমাত্র ‘সালাফী’ নাম ধারণ করলেই কেউ প্রকৃত সালাফী হয়ে যায় না। আবার কেউ এই পরিচয় ব্যবহার না করলেও, যদি সে সালাফদের পদ্ধতি অনুসরণ করে, তবে সে প্রকৃতপক্ষে সালাফির অন্তর্ভুক্ত।
৩. কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভুলকে সালাফিয়্যাহর উপর আরোপ করা যাবে না। ভুল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হতে পারে, মানহাজের নয়। তাই সার্বিকভাবে সালাফিয়্যাহকে সমালোচনা করা একটি অযৌক্তিক ও অ-বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
৪. সালাফিয়্যাহ মানে সব বিষয়ে ঐক্য নয়। ফিকহী বা রাজনৈতিক বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। সালাফদের মধ্যেও এ ধরনের মতপার্থক্য ছিল, তবুও তারা পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখেছেন।
৫. কোনো ব্যক্তি কিছু ভুল করলেও, যতক্ষণ সে মূলনীতিতে অবিচল থাকে, ততক্ষণ তাকে সালাফিয়্যাহ থেকে বের করে দেওয়া যায় না, যদি না সে মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
৬. সালাফিয়্যাহ একটি ব্যাপক পরিসরের বিষয়। এটি কোনো ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইসলামের মূলধারার প্রতিনিধিত্ব করে। প্রকৃতপক্ষে, একজন মুসলিমের স্বাভাবিক পথই হলো কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফদের বুঝ অনুযায়ী অনুসরণ করা।
৭. তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব মত ও ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য। সালাফিয়্যাহর নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে, যার বাইরে গেলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
৮. সালাফিয়্যাহর সমালোচনা করতে হলে ব্যক্তি ও মানহাজের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ব্যক্তির ভুলের সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তা পুরো মানহাজের উপর আরোপ করা অন্যায়।
সর্বোপরি সালাফিয়্যাহর বিরুদ্ধে আক্রমণ কখনো বন্ধ হবে না। কারণ, এটি কুরআন ও সুন্নাহকে কেন্দ্র করে এবং সালাফদের বুঝকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, যা ইসলামের বিশুদ্ধ রূপের প্রতিনিধিত্ব করে। আর এই বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতাই অনেকের জন্য অস্বস্তিকর।
সালাফিয়্যাহ মানুষকে শেখায় নস (দলীল) অনুসরণ করতে, নিজের ইচ্ছাকে নয়; সত্যকে খুঁজতে, নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে নয়; এবং দ্বীনের একটি নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অর্থ রয়েছে এই বিশ্বাসে অটল থাকতে। সুতরাং, সালাফিয়্যাহ কোনো দল নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত মানহাজ, যা মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করে এবং ইসলামের মূল শিক্ষা সংরক্ষণ করে।
– আরবী থেকে সংক্ষেপিত।
অনুবাদ: আব্দুল হাকীম মাদানী।
আল-ইলম ইনস্টিটিউট রাজশাহী-৬২০৩।