ত্বলিবুল ইলম, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সময়ের দায়িত্ব: সালাফদের দৃষ্টিতে একটি সচেতন ইলমী জীবন
(طالب العلم وترتيب الأولويات وواجب الوقت)
ইলম মহামহিম আল্লাহর এক মহান নিয়ামত। কিন্তু ইলমের পথ কেবল বইয়ের পাতা উল্টানো নয়, ক্লাস করা নয়, নতুন নতুন মাসআলা জানা নয়। বরং ইলমের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা দায়িত্ববোধের সাথে, অগ্রাধিকারবোধের সাথে এবং সময় সচেতনতার সাথে যুক্ত হয়। একজন ত্বলিবুল ইলম, যে ব্যক্তি ইলমের পথে হাঁটছে, সে যদি জানেই না কী আগে করবে, কী পরে করবে, কোন কাজ তার জন্য এখন ফরয আর কোনটা অপেক্ষামাত্র; তাহলে সে ইলমের পথে থেকেও বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে।
অগ্রাধিকার নির্ধারণ: ইলমী জীবনের প্রথম শর্ত-
সালাফদের কাছে জ্ঞানের মানে শুধু তথ্য জানা ছিল না; বরং কাজগুলোকে মর্যাদাক্রমে সাজিয়ে নেওয়াই ছিল প্রকৃত ইলমী বুঝ। এজন্যই বলা হয়েছে- الفقه معرفة مراتب الأعمال -অর্থাৎ, ফিক্বহ তথা বুঝ হলো আমলগুলোর মর্যাদার স্তর জানা ও সেভাবে নিজেকে পরিচালনা করা।
যে ত্বলিবুল ইলম বুঝতে পারে না, কোন কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা কম; কোনটা জরুরি, কোনটা অপেক্ষাকৃত গৌণ, সে প্রকৃত অর্থে বুঝদার নয়, বরং সে অগোছালো শ্রমিক মাত্র।
ইলমের পথের প্রথম অগ্রাধিকার: ঈমান ও আক্বীদাহ-
ইলমের শুরুর স্তরই যদি দুর্বল হয়, আক্বীদাহ যদি সঠিক না থাকে, নিয়ত যদি পবিত্র না হয়, তাহলে ইলম বরকত দেয় না। সালাফগণ বলতেন- من أصلح سريرته أصلح الله علانيته -অর্থাৎ, যে তার অন্তরকে ঠিক করে নেয়, মহান আল্লাহ তার প্রকাশ্য আমলও ঠিক করে দেন। তাই একজন সত্যিকারের ত্বলিবুল ইলম নিজের আক্বীদাহ, আমল ও নিয়তকে প্রথমে অগ্রাধিকার দেয়। তাওহীদ, সুন্নাহর অনুসরণ, তাকওয়ার চর্চা এসব ছাড়া ইলম কেবল মানসিক বোঝা, হৃদয়ের আলো নয়।
ফরয আগে, এরপর নফল: এটাই সালাফদের শিক্ষা-
সালাফদের পথের একটি বিশাল বৈশিষ্ট্য ছিল তারা কখনো এমন কাজে শক্তি দিতেন না, যা জরুরি কাজকে পিছিয়ে দেয়। ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন- العاقل من عرف شرف الوقت ولم يضيعه فيما لا ينفع -অর্থাৎ, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে সময়ের মর্যাদা জানে এবং অকারণ কাজে তা নষ্ট করে না।
একজন জ্ঞানসন্ধানী প্রথমে শিখবে ঈমান ও আক্বীদাহ, কুরআন তিলাওয়াত, ইবাদাহ শুদ্ধ করার জ্ঞান, নিজের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, এরপর অতিরিক্ত গবেষণা, গৌণ বিষয়, তাত্ত্বিক আলোচনা।
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন- طلب العلم أفضل من صلاة النافلة – অর্থাৎ, ইলম অর্জন অনেক নফল ইবাদাহর চেয়েও উত্তম। কিন্তু এই কথাটি সেই ইলমের ক্ষেত্রে, যা ফরয, যা জরুরি, যা ওয়াজিবুল ওয়াক্ত। অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, তর্ক, দলীয় উগ্রতা এগুলো কখনোই উদ্দেশ্য নয়।
ইলম ধীরে ধীরে অর্জন, কিন্তু দৃঢ় ভিত্তির উপর-
সালাফরা তাড়াহুড়া পছন্দ করতেন না। তারা বলতেন আজ এক বই, কাল আরেক বই; আজ এক শায়খ, কাল আরেক শায়খ; আজ এক বিষয়, কাল আরেক বিষয়; এভাবে কখনো দৃঢ় ইলম তৈরি হয় না।
তাদের নীতি ছিল- আগে ভিত্তি। তারপর প্রশিক্ষণ।তারপর শেষে গভীরতা ও গবেষণা।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, من تفقّه من الكتب ضلّ – অর্থাৎ, যে কেবল বই থেকে একলা ফিক্বহ তথা গভীর জ্ঞান শিখতে চায়, সে পথভ্রষ্ট হয়। অর্থাৎ, পথ দেখানো উস্তায, সঠিক ক্রম ও সঠিক অগ্রাধিকার ছাড়া ইলম বরকতহীন হয়ে যায়।
আর واجب الوقت তথা সময় যা দাবি করে, সেটাই প্রকৃত দায়িত্ব-
সালাফদের একটি প্রখর বোধগুণ ছিল কোন সময় আমার কাছে মহান আল্লাহ কী চাইছেন? এই বোধই হলো واجب الوقت তথা সময়ের আবশ্যকীয় দায়িত্ব।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন- العبرة بواجب الوقت – অর্থাৎ, মূল কথা হলো সময় যা দাবি করছে সেটাই করা। এভাবে যখন পরীক্ষা সামনে তখন ইলমী পরিশ্রমই অগ্রাধিকার। যখন পরিবার দায়িত্ব চায়, তখন দায়িত্বই অগ্রাধিকার। যখন সমাজে ফিতনা, তখন হক্ব কথা বলা অগ্রাধিকার। যখন নফস দুর্বল, তখন আত্মশুদ্ধি অগ্রাধিকার। যখন উস্তায নির্দেশ দেন, তখন তা-ই অগ্রাধিকার অর্থাৎ, ইলমী জীবনে কোনো কাজই অন্ধভাবে নয়; বরং সময় অনুযায়ী সচেতনভাবে।
সালাফদের জীবন: সময় সচেতনতার জীবন্ত উদাহরণ-
ইমাম হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, يا ابن آدم إنما أنت أيام، كلما ذهب يوم ذهب بعضك – অর্থাৎ, হে আদমসন্তান! তুমি আসলে কেবলই কিছু দিন। প্রতিটি দিন চলে যায়, আর তোমার কিছু অংশ চলে যায়।
ইমাম ইবনুল ক্বয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الوقت سيف إن لم تقطعه قطعك – অর্থাৎ, সময় এক ধারালো তলোয়ার; তুমি যদি এটাকে কাটতে না পারো, সে তোমাকে কেটে দেবে। সালাফদের কাছে সময় মানে ছিল জীবন। তাই তাদের ইলমি জীবন ছিল পরিকল্পিত, দায়িত্বশীল, এবং সর্বোপরি আল্লাহমুখী।
একজন আদর্শ ত্বলিবুল ইলম কেমন হবে?
একজন সত্যিকারের জ্ঞানসন্ধানী হলো সেই- যে জানে কোন কাজ আগে, কোনটা পরে। যে ফরয দায়িত্বকে নফলের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়। যে সময়কে ইলম ও আমলের সোপানে পরিণত করে। যে ইলমকে আলো বানায়, বোঝা বানায় না। যে ইলম দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, নাম-যশ নয়।
পরিশেষে ত্বলিবুল ইলম এর ইলম অর্জন কেবল তথ্য সংগ্রহ নয় বরং এটি একটি সংগঠিত, অগ্রাধিকারনির্ভর, সময়সচেতন, আল্লাহমুখী জীবনযাত্রা। অগ্রাধিকার নির্ধারণ তাকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচায়; আর واجب الوقت তথা সময়ের দাবী তাকে সঠিক সময়ে সঠিক দায়িত্বে দৃঢ় রাখে। মহান আল্লাহ আমাদের এমন জ্ঞানসন্ধানী বানান, যারা ইলমকে আমল, ঈমান ও দায়িত্ববোধের আলোয় পরিণত করে। আমীন!
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
www.ilmacademyedu.com