(الزهد في الدنيا عند السلف الصالح)
দুনিয়া এই ক্ষণস্থায়ী জীবন সালাফে সালিহীনের দৃষ্টিতে কখনোই লক্ষ্য ছিল না; বরং তা ছিল আখিরাতে পৌঁছানোর একটি সেতু মাত্র। তাঁরা দুনিয়াকে ঘৃণা করেননি, কিন্তু দুনিয়ার মোহকে ভয় করতেন। তাঁদের যুহদ ছিল অন্তরের; বাহ্যিক দারিদ্র্য নয়, বরং হৃদয়ের স্বাধীনতা।
হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহ অত্যন্ত গভীর ভাষায় দুনিয়ার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, الدُّنْيَا دَارُ مَمَرٍّ وَلَيْسَتْ دَارَ مَقَرٍّ -দুনিয়া হলো পার হওয়ার ঘর, স্থায়ীভাবে বসবাস করার স্থান নয়। এই উপলব্ধিই সালাফদের জীবনকে আখিরাতমুখী করেছিল। তারা জানতেন- যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ঘর বানায়, সে আখিরাত হারায়।
সালাফরা দুনিয়াকে যেভাবে দেখতেন, তা ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী। আলী ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু দুনিয়ার প্রতি নিজের অবস্থান প্রকাশ করে বলেছিলেন, يَا دُنْيَا غُرِّي غَيْرِي، قَدْ طَلَّقْتُكِ ثَلَاثًا -হে দুনিয়া! অন্য কাউকে ধোঁকা দাও। আমি তো তোমাকে তিন তালাক দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এটি কোনো আবেগী বক্তব্য নয়; বরং দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত এক ঈমানদারের দৃঢ় ঘোষণা। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝেছিলেন, দুনিয়ার সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক যত গভীর হবে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তত দুর্বল হবে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু যিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী শাসক তাঁর জীবন ছিল যুহদের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি বলতেন, لَوْ شِئْتُ لَكُنْتُ أَطْيَبَكُمْ طَعَامًا وَأَلْبَسَكُمْ لِيَانًا، وَلَكِنِّي أَسْتَبْقِي طَيِّبَاتِي لِلْآخِرَةِ -আমি চাইলে তোমাদের চেয়ে উত্তম খাবার খেতে পারতাম এবং নরম পোশাক পরতে পারতাম; কিন্তু আমি আমার উত্তম জিনিসগুলো আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে চাই। এখানেই সালাফদের যুহদের ভারসাম্য স্পষ্ট তাঁদের কাছে দুনিয়া হারাম ছিল না, কিন্তু আখিরাত ছিল অগ্রাধিকার।
তাবেঈদের যুগে এসে এই দুনিয়াবিমুখ চিন্তা আরও গভীর হয়। হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, مَا الدُّنْيَا إِلَّا كَظِلٍّ، إِنْ طَلَبْتَهُ فَاتَكَ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ أَدْرَكَكَ -দুনিয়া হলো ছায়ার মতো, তুমি যদি তাকে ধরতে যাও, সে পালিয়ে যাবে; আর যদি তাকে ছেড়ে দাও, সে নিজেই তোমার পেছনে আসবে। এই উক্তি শুধু দুনিয়ার বাস্তবতা নয়, বরং দুনিয়ার মনস্তত্ত্বকেও উন্মোচন করে। দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লালসাই মানুষকে সর্বস্বান্ত করে।
সুফিয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন অন্তরের রোগ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তিনি বলতেন, الزُّهْدُ فِي الدُّنْيَا قِصَرُ الْأَمَلِ -দুনিয়ায় যুহদের প্রকৃত অর্থ হলো দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেওয়া। কারণ দীর্ঘ আশা মানুষকে গাফিল করে তোলে, মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর তাওবাকে বিলম্বিত করে।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ যুহদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, الزُّهْدُ تَرْكُ مَا لَا يَنْفَعُ فِي الْآخِرَةِ -যুহদ হলো যা আখিরাতে উপকারে আসবে না, তা ত্যাগ করা। এটি দুনিয়া ত্যাগের আহ্বান নয়; বরং দুনিয়ার ভেতর থেকেও আখিরাতকে বেছে নেওয়ার শিক্ষা।
আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনা করে বলেছিলেন, إِنَّمَا تَقْطَعُونَ مِنَ الدُّنْيَا لِلْآخِرَةِ، فَلَا تَقْطَعُوا مِنَ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا -তোমরা তো দুনিয়া থেকে কেটে আখিরাতের জন্য যাচ্ছ; তাহলে আখিরাত কেটে দুনিয়ার জন্য কেন যাবে? এই সংক্ষিপ্ত বাক্যেই সালাফদের পুরো জীবনদর্শন ধরা পড়ে।
সালাফদের দুনিয়া বিমুখতা ছিল অন্তরের এক সচেতন অবস্থা। তারা দুনিয়ায় থেকেও দুনিয়ার দাস ছিলেন না। তাদের হৃদয় বাঁধা ছিল আখিরাতের সঙ্গে, আর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে। আজকের দুনিয়ামুখী জীবনে সালাফদের এই যুহদ আমাদের জন্য শুধুই ইতিহাস নয়; বরং আত্মরক্ষার একটি জরুরি পথনির্দেশ। আমরা দুআ করি-
اللَّهُمَّ اجْعَلِ الدُّنْيَا فِي أَيْدِينَا وَلَا تَجْعَلْهَا فِي قُلُوبِنَا
হে আল্লাহ! দুনিয়াকে আমাদের হাতে দিন, হৃদয়ে নয়।
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।