সূরা আল-ফাতিহা
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
এই মহান আয়াতটি জুমলাহ খবরী বাক্য (جملة خبرية) হলেও এর উদ্দেশ্য হলো ইনশা (নির্দেশ/উচ্চারণ)। অর্থাৎ, যেন বলা হচ্ছে যে, তোমরা বলো সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক।”
এখানে الحمد শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থবহ। এটি শুধু প্রশংসা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি এমন প্রশংসা, যা তাঁর সকল গুণাবলি (صفات الكمال), অগণিত নেআমত (ظاهرة ও باطنة) এবং তাঁর কার্যাবলি (فضل ও عدل) সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই বলা হয়, হামদ (الحمد) হলো মদহ (مدح) থেকে বিশেষ এবং শুকর (شكر) থেকে ব্যাপকতর।
এখানে لِلَّهِ এখানে لام (লামের হরফ) এসেছে অধিকার (استحقاق) বোঝাতে। অর্থাৎ, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য, তিনি ছাড়া আর কেউ এর যোগ্য নন।
আল্লাহ (الله) এই নামটি এমন এক বিশেষ নাম, যা একমাত্র সত্য ইলাহ সত্তাকে নির্দেশ করে। তিনি সেই সত্তা, যাকে সৃষ্টি জগত ভালোবাসা, ভয়, বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে ইবাদত করে। এই নামের মধ্যে আল্লাহর সকল সুন্দর নাম (أسماء الحسنى) ও মহান গুণাবলি (صفات العلى) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, الحمد لله এর অর্থ সমস্ত কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর বান্দাদের অগণিত নেআমত দান করেছেন, যার হিসাব কেউ করতে পারে না। তিনি তাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য সক্ষম করেছেন, দুনিয়াতে রিযিক দিয়েছেন, এবং আখিরাতের স্থায়ী সুখের পথ দেখিয়েছেন, সবই বান্দাদের কোনো প্রাপ্যতা ছাড়াই। অতএব, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য।
এরপর আসে رَبِّ الْعَالَمِينَ অর্থাৎ, সকল জগতের প্রতিপালক। এখানে العالمين বলতে বোঝানো হয়েছে মানুষ, জিন, ফেরেশতা, জীবজন্তু এমনকি আমরা যা জানি এবং যা জানি না, সব সৃষ্টি জগত। প্রতিটি সৃষ্টিই একটি আলাম (عالم), কারণ এগুলো তাদের স্রষ্টার অস্তিত্বের নিদর্শন।
এরপর رب শব্দের অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি মৌলিক দিক। যথা-
১. خلق (সৃষ্টি করা)
২. ملك (মালিকানা/অধিকার)
৩. تدبير (পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা)।
অর্থাৎ, আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা, মালিক এবং পরিচালনাকারী। তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী সমস্ত সৃষ্টিকে পরিচালনা করেন এবং ধাপে ধাপে লালন-পালন করেন।
এই আয়াতের ফযীলত সম্পর্কেও সহীহ হাদীসে এসেছে। রাসূল ﷺ বলেছেন, الحمد لله تملأ الميزان অর্থাৎ, আলহামদুলিল্লাহ মীযান (আমলনামা) পূর্ণ করে দেয় (সহীহ মুসলিম)। অর্থাৎ, এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে এমন গভীরতা ও মর্যাদা রয়েছে, যা আখিরাতে বান্দার আমলনামাকে ভারী করে দেবে।
আর رَبِّ الْعَالَمِينَ এর ব্যাখ্যা আমরা কুরআনের অন্য জায়গায়ও পাই, যেখানে ফেরাউন মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞেস করেছিল, রব্বুল আলামীন কে? তখন তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তিনি আসমানসমূহ, জমিন এবং এদের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক (সূরা আশ-শুআরা)।
সারসংক্ষেপে, এই আয়াত আমাদের শেখায় আপনি যেন আপনার হৃদয়, জিহ্বা ও কর্মের মাধ্যমে স্বীকার করেন যে, আল্লাহই একমাত্র সত্তা, যিনি সমস্ত প্রশংসার যোগ্য। তিনি আমাদের স্রষ্টা, রিজিকদাতা, পরিচালনাকারী এবং প্রতিপালক। তাঁর নেয়ামত অসংখ্য, তাঁর গুণাবলি পূর্ণাঙ্গ, এবং তাঁর দয়া সর্বব্যাপী।
তাই আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই উপলব্ধি জাগ্রত রাখুন, الحمد لله رب العالمين অর্থাৎ, সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।