আত্মার আদব
[নেয়ামত, লজ্জাশীলতা ও অন্তরের জাগরণ]
মানুষের হৃদয়ে কঠোরতা একদিনে জন্ম নেয় না। তা ধীরে ধীরে আসে। কখনো গুনাহের কারণে, কখনো গাফিলতির কারণে, কখনো আবার নেয়ামতের সঙ্গে অতিরিক্ত অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে। আমরা যখন কোনো নেয়ামতকে প্রতিদিনের স্বাভাবিক বিষয় মনে করতে শুরু করি, তখন তার সৌন্দর্য আর আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। বিস্ময় হারিয়ে যায়, কৃতজ্ঞতা দুর্বল হয়ে পড়ে, আর অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকে।
ঘুম আমাদের কাছে সাধারণ একটি বিষয়। অথচ পৃথিবীতে কত মানুষ আছে, যারা রাতের পর রাত অনিদ্রার সঙ্গে লড়াই করে। সকাল আমাদের কাছে প্রতিদিনের স্বাভাবিক শুরু। অথচ প্রতিটি সকালই আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন জীবন, নতুন সুস্থতা, নতুন সুযোগ। আমরা চোখ খুলে দিন শুরু করি, কিন্তু ভাবি না এই চোখ খোলা, এই শ্বাস নেওয়া, এই জেগে ওঠা সবই মহান আল্লাহর নীরব দয়া।
একটু নিজের সকালকে দেখুন!
আপনার বুকের ভেতর হৃদয় নীরবে ধুকধুক করছে।
আপনার ফুসফুস বিনা অনুমতিতে বাতাস নিচ্ছে ও ছাড়ছে।
আপনার চোখ আপনাকে পথ দেখাচ্ছে।
আপনার স্মৃতি প্রিয়জনদের মুখ ধরে রেখেছে।
আপনার পা আপনাকে গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে।
আপনার জিহ্বা কথা বলছে।
আপনার কান মানুষের কথা শুনছে।
আপনার বুদ্ধি ভালো-মন্দ বুঝতে সাহায্য করছে।
এসবের কতটুকু আমরা নিজের শক্তিতে পেয়েছি? কিছুই না। বরং এগুলো সবই মহান আল্লাহর দান। অথচ অভ্যাসের কারণে আমরা এগুলোকে নিজের অধিকার মনে করি। যেন এগুলো থাকবেই। যেন এগুলো হারানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ সত্য হলো প্রতিটি নেয়ামত মহান আল্লাহর আমানত। তিনি দিয়েছেন, তিনিই ধরে রেখেছেন, তিনিই চাইলে ফিরিয়ে নিতে পারেন।
জীবন শুধু হারানোর গল্প নয়। জীবন শুধু অপূর্ণতার তালিকা নয়। ক্লান্ত মানুষ যখন শুধু নিজের না-পাওয়ার দিকে তাকায়, তখন সে নিজের চারপাশের অগণিত প্রাপ্তি দেখতে পায় না। অথচ আমাদের খুব কাছেই কত ছোট ছোট নেয়ামত ছড়িয়ে আছে যেগুলো সাধারণ চোখে ছোট, কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের কাছে অমূল্য ধন।
মায়ের দুআ।
একজন সৎ বন্ধুর নসীহত।
শিশুর নির্মল হাসি।
একটি আয়াত পড়তে পারার ক্ষমতা।
নিজের পায়ে হাঁটার শক্তি।
সুস্থ মস্তিষ্ক।
শান্তিতে কেটে যাওয়া একটি দিন।
ঘরে ফিরে আসার নিরাপত্তা।
মানুষের সামনে সম্মান নিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ।
আর আল্লাহর সেই অদৃশ্য পর্দা, যা আমাদের কত দোষ, ভুল ও দুর্বলতা ঢেকে রেখেছে।
আল্লাহ যদি আমাদের গোপন দুর্বলতাগুলো মানুষের সামনে খুলে দিতেন, হয়তো অনেক সম্মান ভেঙে যেত। অনেক সম্পর্ক বদলে যেত। মানুষের চোখে আমাদের যে সুন্দর ছবি আছে, তা হয়তো টিকে থাকত না। কিন্তু আল্লাহ ঢেকে রেখেছেন। বারবার ঢেকেছেন। আমরা ভুল করেছি, তিনি প্রকাশ করেননি। আমরা দুর্বল হয়েছি, তিনি মানুষকে দেখাননি। আমরা হোঁচট খেয়েছি, তিনি আমাদের আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছেন।
এটাই গোপনীয়তা বা ستر-এর নেয়ামত।
এটাই আল্লাহর ঢেকে রাখার দয়া।
কত বিপদ আমাদের কাছে আসার আগেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কত দুর্ঘটনা আমাদের ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কত দুআর ফল আমরা বুঝতেই পারিনি।
কত অজানা রহমত আমাদের জীবনকে নীরবে রক্ষা করেছে।
আমরা জানি না, কতবার আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন। আমরা জানি না, কত বিপদ আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছিল, তারপর আল্লাহর لطف তথা দয়া তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। আমরা জানি না, কোন বিলম্ব আমাদের জন্য রহমত ছিল। আমরা জানি না, কোন না-পাওয়া আমাদের জন্য বড় বিপদ থেকে মুক্তি ছিল।
মানুষ অনেক সময় ভাবে আমি পাইনি, তাই আমি বঞ্চিত। কিন্তু মুমিন ভাবে হয়তো আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। হয়তো এই বিলম্বের ভেতর হিকমত আছে।
হয়তো এই অপেক্ষার শেষে আমার জন্য উত্তম কিছু রাখা আছে। হয়তো যা আজ পাইনি, তা পেলে আমার হৃদয় ভারী হয়ে যেত, আমার ঈমান দুর্বল হয়ে যেত, আমার জীবন অন্যদিকে চলে যেত।
আল্লাহর দয়া কত বিস্তৃত!
সূর্য প্রতিদিন ওঠে নেককারের ওপরও, গুনাহগারের ওপরও।
রিযিক নেমে আসে কৃতজ্ঞের ঘরেও, অকৃতজ্ঞের ঘরেও।
বাতাস প্রবাহিত হয়।
পানি পাওয়া যায়।
শরীর কাজ করে।
পরিবার পাশে থাকে।
জীবন চলতে থাকে।
অথচ আমাদের ইস্তিগফার কম।
আমাদের শোকর কম।
আমাদের আমল অসম্পূর্ণ।
আমাদের গুনাহ অনেক।
আমাদের মনোযোগ দুর্বল।
আমাদের ইবাদতেও ঘাটতি।
তারপরও আল্লাহর দরজা বন্ধ হয় না।
তারপরও তিনি ডাকেন।
তারপরও তিনি রিযিক দেন।
তারপরও তিনি ঢেকে রাখেন।
তারপরও তিনি ফিরে আসার সুযোগ দেন।
এখান থেকেই জন্ম নেয় আসল حياء তথা প্রকৃত লজ্জাশীলতা। এটি মানুষের সামনে সংকোচ নয়; এটি রবের সামনে অন্তরের নরম হয়ে যাওয়া।
যে হৃদয় বুঝে, আমি আল্লাহর দানে ডুবে আছি, তাঁর لطف তথা দয়ায় বেঁচে আছি, তাঁর ستر-এ রক্ষিত আছি, তাঁর রহমতে ঘেরা আছি, সে হৃদয় আল্লাহর অবাধ্য হতে লজ্জা পায়।
সে ভাবে যিনি আমাকে এত দিয়েছেন, আমি কীভাবে তাঁকে ভুলে থাকি? যিনি আমাকে এত ঢেকে রেখেছেন, আমি কীভাবে প্রকাশ্যে তাঁর নাফরমানি করি? যিনি আমার ওপর এত ইহসান করেছেন, আমি কীভাবে তাঁর ইহসানের জবাব গাফিলতি দিয়ে দিই?
এই লজ্জাই আত্মাকে সুন্দর করে।
এই লজ্জাই চরিত্রকে কোমল করে।
এই লজ্জাই মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে।
এই লজ্জাই বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়।
এই অর্থের এক উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন উসমান ইবনু আফফান رضي الله عنه। তাঁর حياء ছিল গভীর, নির্মল ও অত্যন্ত পবিত্র। তাঁর অন্তরের স্বচ্ছতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ফেরেশতারাও তাঁর থেকে লজ্জা করতেন।
একবার উসমান رضي الله عنه রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তখন নবী ﷺ নিজের বসার ভঙ্গি ঠিক করলেন এবং কাপড় গুছিয়ে নিলেন। এরপর বললেন,
«أَلَا أَسْتَحِي مِنْ رَجُلٍ تَسْتَحِي مِنْهُ الْمَلَائِكَةُ»
আমি কি এমন ব্যক্তির থেকে লজ্জা করব না, যার থেকে ফেরেশতারাও লজ্জা করে?
কী অসাধারণ মর্যাদা!
একজন মানুষের হৃদয় এত পবিত্র হতে পারে, আত্মা এত কোমল হতে পারে, অন্তর এত লজ্জাশীল হতে পারে যে, ফেরেশতারাও তার পবিত্রতার সামনে حياء অনুভব করে।
আমাদেরও প্রয়োজন এমন আত্মা, যে নেয়ামত চিনবে, গাফিল হবে না। এমন হৃদয়, যে আল্লাহর দান দেখে নরম হবে। এমন চোখ, যে শুধু না-পাওয়া নয়, পাওয়া জিনিসও দেখবে। এমন জিহ্বা, যে অভিযোগের আগে শোকর করবে। এমন জীবন,





