ইলমের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের মর্যাদা চিনতে শেখা। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের জীবন ইলমের পেছনে ব্যয় করেছেন, যাঁদের জ্ঞান ও গবেষণার ওপর পরবর্তী প্রজন্মের বিশাল ইলমী ঐতিহ্য দাঁড়িয়ে আছে, তাঁদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমাদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর সংযম থাকা দরকার।
ইমাম শাফেয়ী رحمه الله-এর ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী رحمه الله-এর প্রতি যে শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি ছিল, তা এ বিষয়ে আমাদের জন্য অসাধারণ একটি শিক্ষা।
ইমাম শাফেয়ী رحمه الله বলেছেন, মানুষ যদি ফকিহদের যথাযথ মর্যাদা বুঝত, তাহলে তারা জানতে পারত মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মতো ফকিহ তারা আর দেখেনি। তিনি যত ফকিহের সান্নিধ্যে গেছেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর চেয়ে অধিক ফিকহজ্ঞ কাউকে দেখেননি। বরং তাঁর কাছ থেকেই তিনি ফিকহ ও তার গভীর ইলমী ভিত্তি সম্পর্কে এমন অনেক কিছু শিখেছেন, যা বড় বড় আলেমদের পক্ষেও আয়ত্ত করা কঠিন।
তিনি আরও বলেছেন, হালাল-হারাম, ইলাল এবং নাসিখ-মানসুখের জ্ঞানে মুহাম্মদ ইবনুল হাসনের মতো জ্ঞানী কাউকে তিনি দেখেননি। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও প্রজ্ঞার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, তিনি দশ বছর তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন এবং তাঁর কথার বিপুল জ্ঞান নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। এমনকি তিনি যদি তাঁর বুদ্ধির পূর্ণ মাত্রা অনুযায়ী কথা বলতেন, তাহলে তাঁরা তাঁর বক্তব্য বুঝতে সক্ষম হতেন না; কিন্তু তিনি শ্রোতাদের বুদ্ধির স্তর অনুযায়ী কথা বলতেন।
তাঁর ফাসাহাতের প্রশংসায় ইমাম শাফেয়ী رحمه الله-এর এমন কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর ভাষাগত দক্ষতা দেখে তিনি চাইলে বলতে পারতেন, “কুরআন যেন মুহাম্মদ ইবনুল হাসনের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে।”
একটু চিন্তা করুন, যাঁর ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী رحمه الله-এর মতো একজন ইমাম এত উচ্চ প্রশংসা করেছেন, তিনি নিজেই ছিলেন ইমাম আবু হানিফা رحمه الله-এর অন্যতম প্রধান শিষ্য। আর ইমাম আবু হানিফা رحمه الله-এর মতো যাঁর ইলম ও ফিকহের কাছে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য মানুষ ঋণী, তাঁর মর্যাদা বোঝার জন্য আমাদের কতটুকু ইলম, গবেষণা ও ঐতিহাসিক বোধ থাকা প্রয়োজন!
আজকের সময়ে আমাদের একটি বড় সমস্যা হলো কয়েকটি বই পড়ে, কিছু বক্তৃতা শুনে কিংবা কোনো একটি মাসআলায় নিজের কাছে একটি মত অধিক শক্তিশালী মনে হওয়ার কারণে আমরা শতাব্দীর ইলমী ঐতিহ্য বহনকারী ইমামদের ব্যাপারে খুব সহজেই মন্তব্য করে বসি। কখনো এমন ভাষাও ব্যবহার করি, যা তাঁদের ইলমি মর্যাদার সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অবশ্যই আলেমদের কোনো মত ভুল মনে হতে পারে। দলিলের ভিত্তিতে মতভেদও হতে পারে। একজন আলেমের মত গ্রহণ না করাও সম্ভব। কিন্তু মতভেদ আর মর্যাদাহানি এক জিনিস নয়; কোনো মতের সমালোচনা আর সেই মতের প্রবক্তাকে ছোট করা এক বিষয় নয়।
আপনি বলতে পারেন, “এই মাসআলায় আমরা তাঁর সঙ্গে একমত নই।” কিন্তু এর আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করা দরকার যে, যাঁর মতের সমালোচনা করছি, তাঁর ইলম, উসূল, গবেষণা, আরবি ভাষা, হাদিস ও ফিকহের ব্যাপ্তি এবং তাঁর সময়ের ইলমী পরিমণ্ডল সম্পর্কে আমি আসলে কতটুকু জানি?
কারণ ইলমের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের অজ্ঞতার সীমা উপলব্ধি করা।
সালাফের ইমামদের মধ্যেও মতভেদ হয়েছে। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে বহু বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কিন্তু সেই মতভেদ তাঁদের একে অপরের ইলম, মর্যাদা ও অবদান অস্বীকার করতে শেখায়নি। বরং তাঁরা জানতেন একজন আলেমের কোনো একটি মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, কিন্তু তার সমগ্র ইলমি ব্যক্তিত্বকে একটি মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না।
আমাদেরও সেই আদব শেখা দরকার।
বড়দের সঙ্গে মতভেদ হতে পারে, কিন্তু বড়দের মর্যাদা নষ্ট করে নয়। দলিলের আলোচনা হতে পারে, কিন্তু বিদ্রূপ করে নয়। গবেষণা হতে পারে, কিন্তু ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নয়।
যে সমুদ্রের গভীরতা আপনি মাপেননি, তার তীরে দাঁড়িয়ে তাকে অগভীর বলে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু এতে সমুদ্র অগভীর হয় না; বরং প্রকাশ পায় আমাদের পরিমাপের সীমাবদ্ধতা।
তাই কোনো ইমামের ব্যাপারে কথা বলার আগে তাঁর ইলমি অবদান, তাঁর যুগ, তাঁর শিক্ষক-শিষ্য পরম্পরা এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তাঁর প্রভাব সম্পর্কে জানা উচিত। কারণ ইতিহাসে যাঁদের ইলমের কাছে শত শত আলেম নিজেদের ঋণী মনে করেছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমাদের নিজেদের অবস্থানটাও একবার ভেবে দেখা দরকার।
মতভেদ থাকবে, গবেষণা থাকবে, দলিলের আলোচনা থাকবে এটাই ইলমের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইলমের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন তার সঙ্গে থাকে বিনয়, ইনসাফ এবং আহলে ইলমের প্রতি যথাযথ সম্মান।
আল্লাহ আমাদেরকে শুধু ইলম অর্জনের তাওফিকই দিন না; বরং কার ইলম কত গভীর, কার মর্যাদা কত উচ্চ এবং কোথায় আমাদের নীরব থাকাই অধিক জ্ঞানসম্মত, সেটিও বোঝার তাওফিক দিন।
৩০ আগষ্ট, রোববার
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
দুনিয়ায় মানুষ সাধারণত দুটি জিনিসের পেছনেই ছুটে বেড়ায় সম্পদ ও সন্তান। অর্থ, প্রতিষ্ঠা, পরিবার, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এসব অর্জনকেই আমরা অনেক সময় জীবনের সাফল্যের মাপকাঠি মনে করি।
কিন্তু হযরত ইবরাহিম عليه السلام আমাদের সামনে সাফল্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মানদণ্ড তুলে ধরেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন—
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
অর্থাৎ, যেদিন মানুষ পুনরুত্থিত হবে, সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করো না। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না; তবে যে ব্যক্তি সুস্থ-সালিম অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে, সে ব্যতীত। সূরা আশ-শু‘আরা: ৮৭–৮৯।
তাহলে কিয়ামতের দিন প্রকৃত সফল কে?
যার সবচেয়ে বেশি সম্পদ আছে সে নয়।
যার সবচেয়ে বেশি সন্তান আছে সে নয়।
যার দুনিয়াবি পরিচিতি ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি সে-ও নয়।
প্রকৃত সফল সে-ই, যে আল্লাহর সামনে একটি ‘কলবুন সালীম’ তথা পরিশুদ্ধ ও সুস্থ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে।
তাই দুনিয়ার বাহ্যিক জীবন গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আমাদের অন্তরের দিকেও মনোযোগী হওয়া জরুরি। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, জুলুম, প্রবৃত্তির দাসত্ব, রিয়া, শিরক, কপটতা ও মানুষের প্রতি অসৎ মনোভাব থেকে।
আমরা ঘর সুন্দর করি, পোশাক সুন্দর করি, শরীরের যত্ন নিই, সম্পদ বাড়ানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করি। অথচ যে অন্তর নিয়ে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সেই অন্তরটিই হয়তো অবহেলায় পড়ে থাকে।
মনে রাখা দরকার—
দুনিয়ার জন্য যতটা শ্রম দিচ্ছেন, নিজের অন্তর সংশোধনের জন্যও অন্তত ততটাই চেষ্টা করুন।
কারণ একদিন এমন একটি দিন আসবে, যেদিন আপনার ব্যাংক ব্যালান্স, সম্পদ, সন্তান, পরিচিতি কিছুই আপনার মুক্তির নিশ্চয়তা দেবে না।
সেদিন আপনার সঙ্গে থাকবে আপনার অন্তর এবং আমল।
তাই আজ থেকেই অন্তরকে প্রশ্ন করুন—
আমার অন্তরে কি হিংসা আছে?
বিদ্বেষ আছে?
রিয়া আছে?
অহংকার আছে?
মানুষের প্রতি জুলুম বা বিদ্বেষ আছে?
আল্লাহর সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক আছে, যা শিরকের দিকে নিয়ে যায়?
কারণ আখিরাতের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি শুধু বাহ্যিক আমল বৃদ্ধি করা নয়; মহান আল্লাহর সামনে একটি পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করা।
দুনিয়ার জন্য সম্পদ জমাই, ভবিষ্যতের জন্য সন্তান গড়ি; কিন্তু আখিরাতের জন্য একটি সুস্থ অন্তরও গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন! বারাকাল্লাহু ফিকুম।





