যখন হৃদয় জেগে ওঠে-
মানুষ জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে কখন যে অনেক দূর চলে যায়, তা সে নিজেও টের পায় না। সকাল থেকে রাত, এক কাজ থেকে আরেক কাজ, এক দায়িত্ব থেকে আরেক ব্যস্ততা, এক লক্ষ্য থেকে আরেক লক্ষ্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়।
তারপর কোনো এক নীরব মুহূর্তে হঠাৎ হৃদয়ের গভীর থেকে একটি প্রশ্ন উঠে আসে-
আমি আসলে কোথায় যাচ্ছি?
প্রশ্নটি কোনো শহর, কর্মস্থল কিংবা পার্থিব গন্তব্যের ব্যাপারে নয়। এটি জীবনের উদ্দেশ্য, দিক ও পরিণতি সম্পর্কে।
কারণ মানুষ অনেক কিছু অর্জন করেও হারিয়ে যেতে পারে। তার দিন ব্যস্ততায় পূর্ণ হতে পারে, অথচ হৃদয় অর্থহীনতায় শূন্য থাকতে পারে। সে বহু কাজ সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু জীবনের আসল কাজটি অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? সূরা আল-মু’মিনূন: ১১৫।
অতএব জীবন কেবল বেঁচে থাকার নাম নয়। জীবন একটি আমানত, একটি পরীক্ষা এবং একটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো গাফেলতি-
গাফেলতির সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, মানুষ যখন গাফেল থাকে তখন সে নিজের গাফেলতিই বুঝতে পারে না।
সে মনে করে, সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে।
তারপর আল্লাহ কখনো একটি ঘটনা দিয়ে, কখনো কোনো প্রিয়জনকে হারানোর মাধ্যমে, কখনো কোনো কথার মাধ্যমে, কখনো একটি আয়াতের মাধ্যমে, আবার কখনো নিজের জীবনের কোনো অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়েন।
হঠাৎ একটি আয়াত চোখে পড়ে।
হঠাৎ কোনো নসীহত হৃদয়ে গিয়ে লাগে।
হঠাৎ কোনো জানাযায় দাঁড়িয়ে নিজের পরিণতির কথা মনে পড়ে।
হঠাৎ রাতের নীরবতায় মনে হয়- এভাবে আর কতদিন?
সেই মুহূর্তটিই হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিরে আসার একটি সুযোগ।
কখনো একটি আয়াত মানুষের বহু বছরের ঘুম ভেঙে দিতে পারে। কখনো একটি মৃত্যু তাকে নিজের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। কখনো একটি ব্যর্থতা তাকে তার প্রকৃত গন্তব্যের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে।
তখন মানুষ তার জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করে।
-যে বয়সকে এতদিন অনেক মনে হতো, তা হঠাৎ অল্প মনে হয়।
-যে সময়কে অবহেলায় নষ্ট করেছে, তার মূল্য বুঝতে শুরু করে।
-যে দুনিয়াবি বিষয়গুলোকে একসময় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো, সেগুলো ছোট হয়ে যায়।
-আর যে কথাটি সে বারবার বলত, আগামীকাল থেকে শুরু করব, সেটি তখন অন্যরকম ভয় জাগায়।
কারণ সে বুঝতে পারে-
আগামীকাল আসবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আল্লাহ বলেন-
وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ
প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে। সূরা আল-হাশর: ১৮।
এখান থেকেই শুরু হয় ফিরে আসার যাত্রা-
ফিরে আসার জন্য আপনাকে আগে নিখুঁত মানুষ হতে হবে না।
আপনার সব দুর্বলতা দূর হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে হবে না।
সব পরিস্থিতি অনুকূলে আসার প্রয়োজন নেই।
ভয় সম্পূর্ণ চলে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন শুধু একটি সত্যিকার জাগ্রত হৃদয় এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
নিশ্চয়ই কাজসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
শুধু উপলব্ধি যথেষ্ট নয়।
অনেক মানুষ জানে কী করা উচিত। অনেকেই নিজের ভুল বুঝতে পারে। কেউ কেউ পথও চিনে ফেলে। কিন্তু জেনে যাওয়া আর পথে চলা এক বিষয় নয়।
আপনি জানেন কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে, কিন্তু শুরু করছেন না।
আপনি জানেন সালাত ঠিক করতে হবে, কিন্তু কাল থেকে বলছেন।
আপনি জানেন গুনাহ ছাড়তে হবে, কিন্তু বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন।
আপনি জানেন ইলম অর্জন করতে হবে, কিন্তু নিয়মিত হওয়ার আগেই থেমে যাচ্ছেন।
তাই হৃদয় জেগে ওঠার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এখন শুরু করব কোথা থেকে?
উত্তর-
এক ধাপ দিয়ে।
সব একদিনে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না।
আজ একটি সালাত আরও সুন্দরভাবে আদায় করুন।
আজ কয়েক আয়াত কুরআন বুঝে পড়ুন।
আজ একটি সহিহ হাদিস শিখুন।
আজ একটি গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।
আজ দশ মিনিট ইলমের জন্য দিন।
আজ নিজের কোনো ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করুন।
তারপর আগামীকাল আবার একটি ধাপ।
পরিবর্তন মানে একদিনে অন্য মানুষ হয়ে যাওয়া নয়
আত্মশুদ্ধির পথ সাধারণত ধীরগতির পথ।
মানুষ পড়ে যাবে, আবার উঠবে।
কখনো উৎসাহ থাকবে, কখনো থাকবে না।
কখনো ইবাদতে স্বাদ পাওয়া যাবে, কখনো হৃদয় ভারী লাগবে।
কখনো মনে হবে অনেক দূর এগিয়ে গেছি, আবার কখনো মনে হবে আগের জায়গাতেই ফিরে এসেছি।
এগুলো দেখে পথ ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
কারণ আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
তাই আজ দশ পৃষ্ঠা পড়ে আগামী এক মাস বন্ধ থাকার চেয়ে প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা পড়া অধিক কার্যকর হতে পারে।
একদিনে অনেক কিছু শুরু করে কয়েকদিন পর সব ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে অল্প দিয়ে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তম।
পড়ে গেলে থেমে যাবেন না-
আপনার অতীত আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয় না।
আপনি যতবার পিছিয়ে পড়েছেন, ততবার ফিরে আসার দরজাও আপনার জন্য খোলা।
আল্লাহ বলেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
বলুন, হে আমার সেই বান্দারা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। সূরা আয-যুমার: ৫৩।
তাই নিজের দুর্বলতাকে অজুহাত বানাবেন না।
আজ যদি গতকাল থেকে ভালো হতে পারেন, সেটিই অগ্রগতি।
আজ যদি একটি গুনাহ কমে, সেটিও অগ্রগতি।
আজ যদি কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক একটু গভীর হয়, সেটিও অগ্রগতি।
আজ যদি আল্লাহকে আগের চেয়ে একটু বেশি মনে পড়ে, সেটিও অগ্রগতি।
পথ দীর্ঘ, কিন্তু প্রতিটি পথই একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয়
আপনার সামনে হয়তো অনেক কিছু করার আছে।
ইলম অর্জন করতে হবে।
নিজেকে সংশোধন করতে হবে।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে।
সুন্নাহ জানতে হবে।
চরিত্র সুন্দর করতে হবে।
গুনাহ থেকে বের হতে হবে।
পরিবারের হক আদায় করতে হবে।
মানুষের জন্য উপকারী হতে হবে।
কিন্তু সবকিছুর ভার একসঙ্গে নিজের ওপর চাপিয়ে দিও না।
আজকের দায়িত্ব আজ পালন করুন।
একটি ধাপ।
তারপর আরেকটি ধাপ।
তারপর আরেকটি।
এভাবেই একদিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখবেন, যে পথটি একসময় অসম্ভব মনে হয়েছিল, আল্লাহর তাওফীকে সেটিই অনেকটা অতিক্রম করে ফেলেছন।
কারণ পরিবর্তনের রহস্য সবসময় বড় কোনো পদক্ষেপে নয়।
কখনো কখনো পরিবর্তনের শুরু হয় একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকে- আমি আজ থেকেই আল্লাহর দিকে ফিরব।
তারপর…
এক ধাপের পর আরেক ধাপ।
আর প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন মহান আল্লাহর সাহায্য, ইখলাস, ধৈর্য ও অবিচলতা।
اللهم أعنّا على ذكرك وشكرك وحسن عبادتك
হে আল্লাহ, আপনার যিকর, আপনার শুকর এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করার জন্য আমাদের সাহায্য করুন।
-আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।





