আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক মানুষের মুখে শুনেছি, তারা চান তাদের সন্তান যেন তাদের জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ হয়ে আসে। তারা নিজেরা জীবনে যা করতে পারেননি, সন্তান যেন তা করতে পারে; যেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছেন, সন্তান যেন সেখানে সফল হয়। যেন সন্তানের সাফল্যের মধ্য দিয়ে নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোও কোনোভাবে পূর্ণতা পায়। হয়তো এ কারণেই তাদের অনেককে দেখেছি, কখনো যথেষ্ট কারণ ছাড়াই, আবার কখনো সামান্য কোনো কারণেও সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর হয়ে উঠতে।
সত্যি বলতে, একসময় এই চিন্তাটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগত না। আমি মনে করতাম, প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবনের পথ নিজেকেই বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। বাবা-মায়ের দায়িত্ব অবশ্যই সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা, তার চরিত্র ও মূল্যবোধ নির্মাণ করা এবং তাকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। কিন্তু সন্তানের কর্মজীবন কিংবা স্বপ্নের জায়গায় নিজের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দেওয়া আমি সমর্থন করতাম না।
কেউ শিক্ষক হতে চেয়েও হতে পারেননি বলে তার সন্তানকেও শিক্ষক হতে হবে, কিংবা একজন কাঠমিস্ত্রি নিজের পেশা পছন্দ করেন বলে সন্তানকেও সেই পেশার উত্তরাধিকারী হতে হবে, এমনটা আমার কাছে তখন অযৌক্তিক মনে হতো। আমি বিশ্বাস করতাম, সন্তানকে নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তারপর সময় চলে গেল। জীবন তার নিজস্ব নিয়মে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিল। আমি যে স্বপ্নগুলো দেখেছিলাম, তার অনেকগুলোই পূরণ হলো না। যে বিষয়গুলো অর্জনের জন্য চেষ্টা করেছি, সেগুলোর অনেকগুলোতেই দীর্ঘ পরিশ্রম, ক্লান্তি ও ব্যর্থতার পর শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতেই ফিরে আসতে হয়েছে। একের পর এক অভিজ্ঞতা আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করাল, যেখানে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, একসময় যাদের চিন্তাকে আমি সমালোচনা করতাম, আমিও ধীরে ধীরে সেই একই অনুভূতির কাছাকাছি চলে এসেছি।
এখন নিজেই সন্তান প্রতিপালন, দাম্পত্যজীবন, পরিবার এবং তারবিয়াহ নিয়ে পড়ছি, ভাবছি, শিখছি। যদি কখনো বিয়ে করি, তাহলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আমার সন্তান আমার অপূর্ণ স্বপ্নের বোঝা বহন করবে না; বরং আমার জীবনের যে ভুলগুলো ও সীমাবদ্ধতা আমি নিজের জীবনে কাটিয়ে উঠতে পারিনি, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন তার জীবনে না ঘটে। আমি যা শিখেছি, সে যেন তা আরও সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পারে। আমি যে সুযোগগুলো পাইনি, সে যেন সেগুলো পায়। আমি যেখানে থেমে গেছি, সে যেন সেখান থেকে আরও দূর এগিয়ে যেতে পারে।
তখন বুঝলাম, সন্তানকে নিজের জীবনের দ্বিতীয় সংস্করণ বানিয়ে ফেলা আর সন্তানকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় একটি সুন্দর পরিবেশ দেওয়া এক জিনিস নয়। প্রথমটি হতে পারে নিজের অপূর্ণতা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, আর দ্বিতীয়টি হতে পারে নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সন্তানের জন্য আরও ভালো একটি পথ তৈরি করা।
জীবন আমাদের অনেক ধারণাকে সময়ের সঙ্গে নতুন করে দেখতে শেখায়। আজ যে বিষয়টিকে আমরা একভাবে বুঝি, কয়েক বছর পর অভিজ্ঞতার আলোকে সেটিই হয়তো অন্যভাবে বুঝতে শুরু করি। কারণ মানুষ শুধু বই পড়ে বদলায় না; মানুষ ব্যর্থতা, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ, অপূর্ণতা, দায়িত্ব এবং জীবনের নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও বদলে যায়।
তাই কোনো একটি মত বা চিন্তাকে আজ আপনার কাছে ভুল মনে হচ্ছে বলে সেটিকে নিয়ে অতিরিক্ত কঠোর হয়ে উঠবেন না। নিজের অবস্থান নিয়ে দৃঢ় থাকুন, কিন্তু নিজের বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারেও সচেতন থাকুন। কারণ সময় কখনো কখনো মানুষকে এমন একটি জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে তাকে নিজের পুরোনো কথাগুলোর দিকেই নতুন চোখে তাকাতে হয়।
সময় বড় অদ্ভুত শিক্ষক, বন্ধু। সে শুধু আমাদের জীবন বদলায় না, আমাদের চিন্তাকেও বদলে দেয়। তাই আজ যে বিষয়কে আপনি কঠোরভাবে অস্বীকার করছেন, কাল হয়তো জীবন আপনাকেই সেই বিষয়টির অন্য একটি দিক বুঝিয়ে দেবে।





