সম্পদ, দান ও দরিদ্রের অধিকার
সৎকর্মশীল মানুষ যখন তার সম্পদ ব্যয় করে, সে আসলে তার অর্থ আল্লাহর হাতে তুলে দেয় না; বরং আল্লাহর কাছে তা উত্তম ঋণ (قرضًا حسنًا) হিসেবে অর্পণ করে। আর সেই ঋণ তখনই আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়, যখন তা কোনো অভাবী মানুষের হাতে গিয়ে তার ক্ষুধা নিবারণ করে, কোনো অসহায়ের প্রয়োজন পূরণ করে কিংবা মানবতার কোনো দুঃখ লাঘব করে।
কারণ দরিদ্রের হাতে পৌঁছানো দান কেবল একজন মানুষের উপকার নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া সম্পদের প্রতি বান্দার দায়িত্বশীলতার প্রকাশ।
তাই যে ব্যক্তি কৃপণতার কারণে কল্যাণের পথে নিজের সম্পদ ব্যয় করতে বিরত থাকে, তার কৃপণতার গভীরে একটি ভয়ংকর সংশয় লুকিয়ে থাকে। সে হয়তো মুখে আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসের কথা বলে, কিন্তু তার হাতের মুঠো তখন সেই বিশ্বাসের সাক্ষ্য দেয় না।
সে কি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দিহান?
নাকি আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে?
নাকি, আরও ভয়ংকরভাবে, তার অন্তরের বিশ্বাসই কি দুর্বল হয়ে পড়েছে?
কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-
﴿وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ﴾
তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে তা প্রদান করবেন। (সূরা সাবা: ৩৯)।
সম্পদ মানুষের হাতে একটি পরীক্ষা। কারও হাতে বেশি থাকা যেমন সম্মানের নিশ্চিত প্রমাণ নয়, তেমনি কম থাকা অপমানেরও প্রমাণ নয়। বরং সম্পদ যার হাতে বেশি, তার দায়িত্বও অনেক বড়। তার সম্পদে অভাবগ্রস্তের অধিকার আছে, তার সামর্থ্যের মধ্যে অসহায়ের জন্য একটি অংশ নির্ধারিত আছে এবং তার প্রাচুর্যের মধ্যে সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি একটি নৈতিক দায় নিহিত রয়েছে।
আর যখন ধনীদের অন্তর থেকে ঈমানের প্রভাব সরে যেতে থাকে, তখন তার সবচেয়ে নির্মম আঘাত গিয়ে পড়ে দরিদ্রের জীবনে। তখন মানুষ ক্ষুধায় মরে, বস্ত্রের অভাবে কষ্ট পায়, চিকিৎসার অভাবে রোগে ভোগে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অকালমৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ, অন্ন-বস্ত্রের অভাব, অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস, এসব যেন ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পাওয়া একই সামাজিক ব্যর্থতার চিহ্ন।
এখানে “ধনীদের কুফর” বলতে মুখে আল্লাহকে অস্বীকার করার কথা নয়; বরং এমন এক অন্তরের অবিশ্বাস, যেখানে মানুষ আল্লাহর দেওয়া সম্পদের মালিকানাকে নিজের একচ্ছত্র অধিকার মনে করে, অথচ সেই সম্পদ যে একটি আমানত এবং তার সঙ্গে মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব জড়িত, তা ভুলে যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ কেবল ভোগের উপকরণ নয়; এটি আমানত (أمانة), পরীক্ষা এবং দায়িত্ব। তাই একজন মুমিনের হাত যখন দানের জন্য খুলে যায়, তখন কেবল একটি দরিদ্র পরিবার উপকৃত হয় না; তার নিজের ঈমানও আমলের মাধ্যমে সত্যায়িত হয়।
সত্যিকারের ইহসান (الإحسان) হলো এমনভাবে দেওয়া, যেখানে দাতা মনে রাখে: আমি দিচ্ছি না, আমাকে দেওয়া সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আর সেই মুহূর্তে দরিদ্র মানুষটি কেবল সাহায্যপ্রার্থী থাকে না; সে হয়ে ওঠে আপনার সম্পদের আখিরাতের পাথেয় হওয়ার একটি মাধ্যম।





