সালাফগণ যেভাবে জুমুআর দিন অতিবাহিত করতেন-
জুমুআ মুসলিম জীবনের সাপ্তাহিক ঈদ, এটি কেবল একটি ফরয সালাত নয়; বরং এটি ইমান, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। সালাফে সালেহীন এই দিনের মর্যাদা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁদের কাছে জুমুআ ছিল উদাসীনতায় কাটানোর দিন নয়; বরং প্রস্তুতি, ইবাদত, দুআ ও অন্তর জাগ্রত করার বিশেষ সময়।
১. জুমুআর দিনের জন্য আগাম প্রস্তুতি-
সালাফগণ জুমুআকে হঠাৎ আসা কোনো দিনের মতো নিতেন না। বরং তাঁরা বৃহস্পতিবার থেকেই মানসিক ও আমলগত প্রস্তুতি নিতেন। ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كان السلف يعظمون يوم الجمعة، ويستعدون له من يوم الخميس -সালাফগণ জুমুআর দিনকে অত্যন্ত মর্যাদা দিতেন এবং বৃহস্পতিবার থেকেই তার জন্য প্রস্তুতি নিতেন। এই প্রস্তুতির মধ্যে ছিল নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচানো, দুনিয়াবি ব্যস্ততা হালকা করা এবং অন্তরকে ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করা।
২. গোসল, পরিচ্ছন্নতা ও সুন্নাহর প্রতি যত্ন-
জুমুআর দিন সালাফগণ বিশেষভাবে পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তাঁরা গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। কারণ এটি ছিল আল্লাহর ঘরের দিকে অগ্রসর হওয়ার দিন। হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كانوا يرون الغسل يوم الجمعة طهارةً للظاهر والباطن -তাঁরা জুমুআর দিনের গোসলকে বাহ্যিক ও অন্তর্গত উভয়ের পবিত্রতা মনে করতেন।
৩. দ্রুত ও আগেভাগে মসজিদে গমন-
সালাফগণ জুমুআর দিন দেরি করতেন না। বরং তাঁরা ফজরের পর থেকেই মসজিদের জন্য প্রস্তুত থাকতেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মসজিদে উপস্থিত হতেন। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ما فاتتني التكبيرة الأولى منذ أربعين سنة -চল্লিশ বছর ধরে আমার প্রথম তাকবীর (তাকবীরাতুল ইহরাম) ছুটেনি। এ কথা জুমুআসহ সব সালাতেই তাঁদের আগ্রহ ও সচেতনতার প্রমাণ বহন করে।
৪. কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও নফল ইবাদত-
মসজিদে পৌঁছে সালাফগণ সময় নষ্ট করতেন না। তাঁরা নফল সালাত আদায় করতেন, কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং যিকিরে মশগুল থাকতেন। ইমাম মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كانوا يكثرون القراءة والذكر يوم الجمعة حتى يخرج الإمام -ইমাম খুতবার উদ্দেশ্যে বের হওয়া পর্যন্ত তাঁরা জুমুআর দিন বেশি বেশি কিরাআত ও যিকির করতেন।
৫. খুতবার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ ও অন্তরের উপস্থিতি-
খুতবা চলাকালে সালাফগণ সম্পূর্ণ নীরবতা ও মনোযোগ বজায় রাখতেন। তাঁরা এটিকে কেবল বক্তব্য নয়; বরং নসীহত ও হিদায়াতের মুহূর্ত হিসেবে দেখতেন। ইবনু আবী শাইবা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, كانوا يعدون الكلام والإشارة حال الخطبة لغواً -খুতবার সময় কথা বলা বা ইশারা করাকেও তাঁরা অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করতেন।
৬. আসরের পর দুআ ও কবুলিয়াতের সময়-এর অপেক্ষা-
সালাফগণ জুমুআর দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে আসরের পরের মুহূর্তগুলোকে দেখতেন। কারণ এ সময় দুআ কবুল হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, هي آخر ساعة من يوم الجمعة -এটি জুমুআর দিনের শেষ সময়। (সহীহ বুখারী)। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ এব্যাপারে বলেন, أكثر الأحاديث على أنها بعد العصر -অধিকাংশ হাদীস প্রমাণ করে এই সময়টি আসরের পর। এই সময় সালাফগণ কিবলামুখী হয়ে বসে থাকতেন, দুআ করতেন, ইস্তিগফার করতেন এবং অন্তরকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করতেন।
৭. দুনিয়াবি গাফিলতি থেকে দূরে থাকা-
জুমুআর দিন সালাফগণ অপ্রয়োজনীয় কথা, হাসি-ঠাট্টা ও দুনিয়াবি ব্যস্ততা এড়িয়ে চলতেন। তাঁদের কাছে এটি ছিল অন্তর শুদ্ধ করার দিন। ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كانوا يرون الاشتغال بالدنيا يوم الجمعة نقصاً في تعظيمه -তাঁরা জুমুআর দিনে দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ততাকে দিনের মর্যাদা কমিয়ে দেওয়া বলে মনে করতেন।
পরিশেষে সালাফে সালিহীনের কাছে জুমুআ ছিল প্রস্তুতির দিন, ইবাদতের দিন, অন্তর জাগ্রত করার দিন এবং দুআ ও আল্লাহর নৈকট্যের দিন। আজ আমাদের জুমুআ যদি কেবল একটি ফরয সালাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সালাফদের পথের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাঁদের জীবন আমাদের শেখায় জুমুআকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার প্রকৃত মর্যাদা ও আত্মিক গভীরতা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সালাফদের মতো জুমুআকে সম্মান করার তাওফীক দিন। আমীন!
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।