ইসলামী হিজরী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস হলো শা’বান (شعبان)। এটি রামাযানের ঠিক পূর্ববর্তী মাস, যেন এক বরকতময় সেতু, যা বান্দাকে রামাযানের মহা ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। সালাফে সালেহীন শা’বান মাসকে অবহেলা করতেন না; বরং একে তাঁরা রামাযানের প্রস্তুতির ময়দান হিসেবে গ্রহণ করতেন।
শা’বান মাসের বিশেষ মর্যাদা-
১. আমল মহান আল্লাহর কাছে উত্থাপিত হওয়ার মাস: উসামা ইবনু যায়দ (رضي الله عنه) বলেন, قلتُ: يا رسولَ اللهِ، لم أركَ تصومُ شهرًا من الشهورِ ما تصومُ من شعبان؟
قال: ذلك شهرٌ يغفلُ الناسُ عنه بين رجبٍ ورمضان، وهو شهرٌ تُرفعُ فيه الأعمالُ إلى ربِّ العالمين، فأحبُّ أن يُرفعَ عملي وأنا صائم অর্থাৎ, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আমি অন্য কোনো মাসে এত বেশি সিয়াম রাখতে দেখিনি, যতটা শা’বান মাসে রাখেন।
তিনি বললেন: এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রামাযানের মাঝখানে হওয়ায় মানুষ অবহেলা করে। অথচ এ মাসেই আমলসমূহ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট উত্থাপিত হয়। আমি পছন্দ করি আমার আমল তখন উত্থাপিত হোক, যখন আমি রোযাদার অবস্থায় থাকি। (সুনান নাসাঈ)।
২. নবী ﷺ শা’বান মাসে অধিক সিয়াম রাখতেন: আয়েশা (رضي الله عنها) বলেন, ما رأيتُ رسولَ الله ﷺ استكمل صيامَ شهرٍ إلا رمضان، وما رأيتُه أكثر صيامًا منه في شعبان -অর্থাৎ, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রামাযান ছাড়া আর কোনো মাস পূর্ণ সিয়াম রাখতে দেখিনি। তবে আমি তাঁকে শা’বান মাসে সবচেয়ে বেশি সিয়াম রাখতে দেখেছি। ( সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
শা’ বান: রামাযানের বাস্তব প্রস্তুতির মাস-
১. নফল সিয়ামের মাধ্যমে শরীর ও মন প্রস্তুত করা: শা’বান মাসে অধিক সিয়াম রাখা রামাযানের ফরয সিয়ামের জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি। এটি হঠাৎ করে সিয়ামের চাপ থেকে রক্ষা করে এবং ইবাদতের ধারাবাহিকতা গড়ে তোলে।
২. কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন: সালাফে সালেহীন শা’বান মাসে কুরআনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতেন। সালামাহ ইবন কুহাইল রহিমাহুল্লাহ বলেন, كان يُقال: شهرُ شعبان شهرُ القُرّاء -বলা হতো যে, শা’বান হলো কুরআন পাঠকদের মাস।
হাবীব ইবন আবী সাবিত রহিমাহুল্লাহ যখন শা’বান মাস আসত, বলতেন, هذا شهرُ القُرّاء -এটি কুরআন তিলাওয়াতকারীদের মাস।
আমর ইবন কাইস আল-মুলাঈ রাহিমাহুল্লাহ শা‘বান এলে নিজের দোকান বন্ধ করে দিতেন এবং পুরো সময় কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করতেন।
৩. অন্তরের তাযকিয়া ও আত্মসমালোচনা: রামাযানের আগে আত্মশুদ্ধি জরুরি। শা’বান হলো গুনাহ থেকে তাওবা করার সময়, অন্তরের রোগ (হিংসা, অহংকার, রিয়া) দূর করার সময় এবং নিয়ত পরিশুদ্ধ করার সময়। ইমাম ইবন রজব আল-হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, فصيامُ شعبان كالتمرين على صيام رمضان -শা’বান মাসের সিয়াম হলো রামাযানের রোযার জন্য অনুশীলনস্বরূপ।
সালাফদের দৃষ্টিতে শা‘বান-
আবু বকর আল-বালখী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, شهرُ رجب شهرُ الزرع، وشعبان شهرُ السقي، ورمضان شهرُ الحصاد – অর্থাৎ, রজব হলো বীজ বপনের মাস, শা’বান হলো সেই বীজে পানি দেওয়ার মাস, আর রামাযান হলো ফসল কাটার মাস।
আমাদের জন্য করণীয়-
শা’বান মাসে আমাদের উচিত হলো:
ক. নফল সিয়াম বৃদ্ধি করা।
খ.কুরআন তিলাওয়াতের নিয়মিত অভ্যাস গড়া
গ. গুনাহ ও অবহেলা থেকে তাওবা করা।
ঘ. রামাযানের আমলের পরিকল্পনা করা
ঙ. দু‘আ করা। মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে রামাযান পর্যন্ত পৌঁছান এবং কবুলযোগ্য ইবাদতের তাওফিক দেন।
সুতরাং শা’বান কোনো সাধারণ মাস নয়; এটি রামাযানের দরজায় পৌঁছানোর প্রস্তুতির সময়। যে ব্যক্তি শা’বানকে অবহেলা করল, সে প্রায়ই রামাযানের প্রথম দিনগুলো হারিয়ে ফেলে। আর যে শা’বানকে যথাযথভাবে কাজে লাগাল, তার জন্য রামাযান হয়ে ওঠে ইবাদতের বসন্ত। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন!
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
হাদীস নববী হিফযের সোনালী পদ্ধতিসমূহ